বাংলাদেশকে জানুন ও জানানঃ পর্ব ০২ – “বাংলার উৎপত্তি”

বৃটিশ উপনৈবিশিক আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে বঙ্গ একটি ভূখণ্ড ছিল । দেশভাগ পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গ আলাদা করে দেয়। পরে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা পর তৈরি হয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সীমান্তের কাঁটাজালে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এপাশে রয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গ। বঙ্গ হোক বা বাংলা, এ নামের উৎপত্তি কীভাবে। ইতিহাসের পাতা উল্টে বেশ কিছুটা সময় পিছিয়ে গেলেও মেলে না সঠিক তথ্য। রয়ে যায় নামকরণে রহস্য।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা হয়েছিল ভারত কিন্তু তার মূল্য চোকাতে হয়েছিল বাংলাকে। র‍্যাডক্লিফের কলমের খোঁচায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল বাঙালির দেশ, বাঙলির হৃদয়। জন্ম নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। আর কাঁটাতারের এপারে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে রয়ে গিয়েছিল তার সহোদর, পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু কী তার ইতিহাস? এই নামের উৎপত্তিই বা কীভাবে?

এই ভূমিতে একসময় ইসলামিক নবাবদেরও শাসন ছিল। ১৭৫৭ সাল থেকে ব্রিটিশ সূর্য ওঠে বাংলার বুকে। ১৯৪৭ সালে দুটি দেশের অঙ্গীভূত হয় বাংলা । ইতিহাসের সঠিক রূপরেখা মিললেও নামের উৎপত্তি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

“বাংলাদেশ” শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায় ২০ শ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “নম নম নম বাংলাদেশ মম” ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” এর ন্যায় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মাধ্যমে সাধারণ পরিভাষা হিসেবে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। অতীতে বাংলাদেশ শব্দটিকে দুটি আলাদা শব্দ হিসেবে “বাংলা” “দেশ” আকারে লেখা হত। বাংলা বা বঙ্গ নামের উৎস সঠিকভাবে জানা যায় না। কারও মতে, খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে এই অঞ্চলে বাস করত দ্রাবিড় উপজাতি। তাদের ভাষা থেকে বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি। আবার সংস্কৃত সাহিত্যেও বঙ্গ নামের উল্লেখ মেলে।

১৯৫০ দশকের শুরুতে, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীরা শব্দটিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল ও সভা-সমাবেশে ব্যবহার করেছে। বাংলা শব্দটি বঙ্গ এলাকা ও বাংলা এলাকা উভয়ের জন্যই একটি প্রধান নাম। শব্দটির প্রাচীনতম ব্যবহার পাওয়া যায় ৮০৫ খ্রিস্টাব্দের নাসেরি ফলকে। এছাড়াও ১১-শতকের দক্ষিণ-এশীয় পাণ্ডুলিপিসমূহে ভাংলাদেসা পরিভাষাটি খুঁজে পাওয়া যায়।
১৪শ শতাব্দিতে বাংলা সালতানাতের সময়কালে পরিভাষাটি দাপ্তরিক মর্যাদা লাভ করে। ১৩৪২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রথম শাহ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। উক্ত অঞ্চলকে বোঝাতে বাংলা শব্দটির সর্বা‌ধিক ব্যবহার শুরু হয় ইসলামী শাসনামলে। ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা অঞ্চলটিকে বাঙ্গালা নামে উল্লেখ শুরু করে।
বাংলা বা বেঙ্গল শব্দগুলোর আদি উৎস অজ্ঞাত; ধারণা করা হয় আধুনিক এ নামটি বাংলার সুলতানি আমলের বাঙ্গালা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক ধারণা করেন যে, শব্দটি বং অথবা বাং নামক একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি বা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বং জাতিগোষ্ঠী ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
অন্য তত্ত্ব অনুযায়ী শব্দটির উৎপত্তি ভাঙ্গা (বঙ্গ) শব্দ থেকে হয়েছে, যেটি অস্ট্রীয় শব্দ “বঙ্গা” থেকে এসেছিল, অর্থাৎ অংশুমালী। শব্দটি ভাঙ্গা এবং অন্য শব্দ যে বঙ্গ কথাটি অভিহিত করতে জল্পিত (যেমন অঙ্গ) প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেদ, জৈন গ্রন্থে, মহাভারত এবং পুরাণে। “ভাঙ্গালাদেসা/ ভাঙ্গাদেসাম” (বঙ্গাল/বঙ্গল)-এর সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ ৩-এর নেসারি প্লেট্‌সে উদ্দিষ্ট (৮০৫ খ্রিস্ট-আগে), যেখানে ভাঙ্গালার রাজা ধর্মপালের বৃত্তান্ত লেখা আছে।
ইয়ুথ ভিলেজ/ এ আর হিমু