বাংলাদেশকে জানুন ও জানানঃ পর্ব ০৩ – “ঢাকা বিভাগ”

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মোঘল যুগের পূর্ব কিছু গুরুত্বধারন করলেও শহরটি ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করে মোঘল যুগে। ঢাকা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট করে তেমন কিছু জানা যায় না। মোঘল পূর্ব যুগের পুরাতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঢাকা শহরে দু’টি এবং মিরপুরে একটি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীনতমটির নির্মাণ তারিখ ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (জোয়াও দ্য ব্যারোস ঢাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখতে পান এবং ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে তার অঙ্কিত মানচিত্রে এর অবস্থান নির্দেশ করেন।১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম খান চিশতি সুবাহ বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করে জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর নামকরণ হলেও সাধারণ মানুষের মুখে ঢাকা নামটিই থেকে যায়। সকল বিদেশী পর্যটক এবং বিদেশী কোম্পানির কর্মকর্তারাও তাদের বিবরণ এবং চিঠিপত্রে ঢাকা নামটি ব্যবহার করেন।


ছবিঃ লালবাগ কেল্লা

ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও প্রশাসনিক বিবর্তন
মুসলিম পূর্ব যুগে বর্তমান ঢাকা জেলা অঞ্চল ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিত প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এর কিয়দংশ কখনো কখনো সমতট এবং কখনো কখনো হরিকল নামে পরিচিত ছিল। এয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বঙ্গ দেশে সেন রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম রাজত্বের সূচনা করেন।
মোঘল যুগের পূর্বে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম শাসকেরা ঢাকার চারিদিকের বিভিন্ন অবস্থানে তাদের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এসব রাজধানী নগরীর কয়েকটি নিদর্শন এখনো বিক্রমপুর, ভাওয়াল ও সোনারগাঁওয়ে দেখা যায়। ১৫৭৫ সালে মোঘলরা পাঠান সুলতানের কাছ থেকে বাংলার শাসনভার ছিনিয়ে নিলেও তাদেরকে বাংলার ভূস্বামী বা ভূইয়াদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য যথেষ্ঠ বেগ পেতে হয়।
১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় একশত বছর ঢাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল। এ শহরে ছিল প্রশাসনিক সদর দফতর এবং সুবাহদার ও অন্যান্য কর্মচারীদের বাসস্থান।
পরবর্তী সুবাহদার শাহ সুজা ঢাকায় নির্মাণ কর্মকান্ড শুরু করেন। শাহ সুজার দীউয়ান মীর আবুল কাশিম ১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বড় নামে একটি সুপ্রশস্ত ইমারত নির্মাণ করেছিলেন। ইমারতটির অবস্থান বুড়িগঙ্গার তীরে এবং বর্তমান চকবাজারের দক্ষিণে।


ছবিঃ আহসান মঞ্জিল

ঢাকার ইতিহাসে বেশ কয়েকটি নির্মাণ কাজের সঙ্গে মীরজুমলা নাম জড়িয়ে আছে, প্রথমে মীরজুমলার গেট পরবর্তী সময়ে যা রমনা গেট নামে পরিচিত হয়। কার্জন হল এর কাছাকাছি ও পুরাতন হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিমে ময়মনসিংহ রোডে গেটটি অবস্থিত।
পরবর্তী সুবাদার শায়েস্তা খান ছিলেন একজন খ্যাতিমান নির্মাতা। অবশ্য তিনি একটি কাটরাও নির্মাণ করেন। এটি ছোট কাটরা নামে পরিচিত, শাহ সুজার বড় কাটরা থেকে পৃথক করার জন্য এ নামকরণ। তিনি বেশ কয়েকটি মসজিদ ও সমাধিসৌধও নির্মাণ করেন। মসজিদ গুলির মধ্যে চকবাজার মসজিদ, বাবুবাজার মসজিদ ও সাতগম্বুজ মসজিদ বিখ্যাত। সমাধিগুলির মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিবি পরীর সমাধি।
বাংলার নওয়াবদের রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান আঠারো শতকের শেষভাগে ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্বকে ম্লান করে দেয়। উপরন্তু, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক ও উৎপাদন নীতি নগরীর আর্থিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়।

ছবিঃ পানাম শহর
উন্নয়নের নতুন ধারা এবং সমৃদ্ধির নতুন যুগের সূত্রপাতের মাধ্যমে ১৮৪০ নগর উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয় । এই নগর উন্নয়নের এ যাত্রা তখন থেকেই অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। প্রশাসনিক ক্রমবৃদ্ধি ইতঃপূর্বে ঢাকা জেলা প্রশাসনের কেন্দ্র ছিল। এটি ১৮২৯ সালে ঢাকা বিভাগ নামে একটি বৃহৎ বিভাগের সদর দফতরে পরিণত হয়। এরপর ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৮৮৫ সালের মধ্যে বঙ্গপ্রদেশে কলকাতার পরে ঢাকা নগরীকে সর্ববৃহৎ বেসামরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলা নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় ঢাকার উথানে অধিকতর স্থায়ী উন্নয়ন সাধিত হয়। এ সময় হতে ঢাকা শুধু এ নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক সদর দফতরই ছিল না বরং এখানে আইন পরিষদ এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসত।
অনেক সংগ্রাম, ত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে নয়মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডি
সেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ঢাকা রাজনৈতিক , প্রশাসনিক কার্যকলাপ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্ররূপে মর্যাদা লাভ করে।

এক নজরে ঢাকা বিভাগ:

অবস্থানঃ ২০●৫১ থেকে ২৫●২৫ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯●১৯ থেকে ৯১●১৫ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ।
সীমানাঃ উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল ও চাঁদপুর জেলা, পূর্বে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলা, পশ্চিমে নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা জেলা।
আয়তন : ৩১০৫১ বর্গ কিঃ মিঃ
লোকসংখ্যা : ৪,৬৭,২৯,০০০
জেলার সংখ্যা : ১৩ টি
উপজেলার সংখ্যা : ৮৮ টি
উন্নয়ন সার্কেল : ০১ টি (তেজগাঁও উন্নয়ন সার্কেল)
থানার সংখ্যা: পুলিশ থানা ১৩৩ টি, মেট্রোপলিটন থানা -৪৯ টি, হাইওয়ে থানা- ০৪ টি
রেলওয়ে থানা-০৪টি, নৌ-থানা-০১ টি
সংসদীয় আসন: ৯৪ টি
সিটি কর্পোরেশন: ০৪ টি ( ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিন, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ)
ইউনিয়ন পরিষদ : ১২৪৮ টি, পৌরসভা: ৮৮ টি, গ্রাম: ২৫২৩৭ টি, মৌজা: ১২৭৬৫ টি
শিক্ষার হার : ৬২%

ঢাকার ঐতিহাসিক স্থানঃ
*লালবাগ কেল্লা * আহসান মঞ্জিল *আরমানী টোলা চার্জ *সোনারগাঁও *পানামসিটি * জাতীয় জাদুঘর * বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল পার্ক * জাতীয় যাদুঘর * মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর * রমনা পার্ক * বাহাদুরশাহ পার্ক * সোরয়ারদী উদ্যান * বোটানিকাল গার্ডেন * বলদা গার্ডেন * জাতীয় বিজ্ঞান যাদুঘর * স্বাধীনতা যাদুঘর * বঙ্গবন্ধু জাদুঘর * বঙ্গবন্ধু নোভ থিয়েটার * জাতীয় সৃত্মি সৌধ * জাতীয় শহীদ মিনার * কার্জন হল * বাইতুল মোকারম মসজিদ * তারা মসজিদ * সাত গুম্বুজ মসজিদ * ঢাকেশ্বরী মন্দির * জঙ্গল বাড়ি দুর্গ * এগার সিন্ধুর দুর্গ * শোলাখিয়া ঈদ গাহ ময়দান * চন্দ্রাবতী মন্দির * ভাওয়াল রাজবাড়ীজাতীয় উদ্যান * নুহাশ পল্লী * বলিয়াদী জমিদার বাড়ী * শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ী * নাগরী টেলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গীর্জা * বড় ভূঁইয়া বাড়ী * টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্স * চন্দ্রা ভর্মা ফোর্ট (কোটাল দুর্গ) * কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈত্রিকবাড়ী * আতিয়া মসজিদ * যমুনা বহুমুখী সেতু * সাগরদীঘি * পাকুটিয়া আশ্রম * ভারতেশ্বরী হোমস * পাকুল্লা মসজিদ * উপেন্দ্র সরোবর * গয়হাটার মঠ * এলেঙ্গা জমিদার বাড়ী * ঐতিহ্যবাহী পোড়াবাড়ি * পাকুটিয়া জমিদার বাড়ী * বায়তুল নূর জামে মসজিদ * দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি * ২০১ গম্বুজ মসজিদ * জাতীয় সংসদ ভবন * তিন নেতার মাজার

ছবিঃ তিন নেতার মাজার

ছবিঃ বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক

ইয়ুথ ভিলেজ/ এ আর হিমু