“জীবনে বলার মত একটা গল্প থাকা দরকার”-ইকবাল বাহার

আমি আমার জীবনে এইচএসসিতে ফেল করেছিলাম – চারিদিকে একটাই আলোড়ন উঠেছিল, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম, নিজেকে আয়নায় দেখে মনে হচ্ছিল এটা তো আমি নই।  ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন ছিল, চান্স পাইনি। তারপর মাস্টার্স ও সিএ পড়লাম, এরপর এমবিএ।  ক্যারিয়ার শুরু করলাম হিসাব বিভাগে, ভালো লাগলো না, তারপর মার্কেটিং অবশেষে উদ্যোক্তা।

গ্রামীণ সাইবারনেট আমার জীবনের প্রথম চাকুরী। চাকুরীর ৩ মাস বয়সে আমি বিয়ে করে ফেলি। গ্রামীণ সাইবারনেট এ চাকুরী না করলে ইন্টারনেট তথা তথ্য প্রযুক্তিটা ভালো করে শিখা হতো না বা প্রযুক্তির প্রতি একটা ভালবাসা তৈরি হতো না । গ্রামীণ সাইবারনেট এ আমি ছিলাম একাউন্টস ম্যানেজার হিসাবে।  গ্রামীণ সাইবারনেটে জব না করলে অপটিম্যাক্স কমিউনিকেশন্স লিমিটেড হতো না । গ্রামীণ সাইবারনেট  না ছাড়লেও অপটিম্যাক্স হতো না, তাহলে হয়তো গ্রামীণ সাইবারনেটেই বা অন্য কোথাও জব করা হতো । তারপর গেলাম গ্রামীণ শক্তিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার হিসাবে । গ্রামীণ শক্তিতে না গেলে অপটিম্যাক্স হতো না কারণ ওখানে গিয়ে স্বপ্ন সত্যি করার কাজ শুরু করি।

তারপর শুরু হল অপটিম্যাক্স এর যাত্রা । কিন্তু যাত্রা টা অতটা শুভ ছিল না। ১৮ মাস এর মাথায় কোম্পানি বন্ধ হবার উপক্রম হল। যারপর নাই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ও অস্বাভাবিক পরিশ্রম করে ও মেধা খাঁটিয়ে আবার হাটি হাটি পা পা করে পরবর্তী ২-৫ বছরে ঘুরে দাঁড়ালাম। মাঝখানে কিছুদিন সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড এ জব করেছি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে । উদ্দেশ্য ছিল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব এর স্বাদ নেয়া ও কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এটা ছিল অপটিম্যাক্স এর শুরুর দিকে। তখন আমি সিঙ্গার বাংলাদেশ এ জব ও অপটিম্যাক্সের কাজ দুটাই একসাথে করতাম। প্রতিদিন গড়ে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতাম, এখনো তাই করি। সিঙ্গার বাংলাদেশের জবে আমার অভিজ্ঞতা অপটিম্যাক্সের গ্রোথ এ অনেক বেশী সাহায্য করেছে।

মাঝখানে আরও একটা কোম্পানি তৈরি করেছিলাম, অতিমাত্রায় আয় রোজগারের সম্ভবনা দেখা দেয়ায়, দ্রুত ঐ কোম্পানি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেই, কারণ সবসময় সৎ থাকতে বাবা শিখিয়েছেন। বুক ফুলিয়ে চলার আশায় ভালোমানুষ হবার লোভটা সবসময় জাগিয়ে রেখেছি।   বেশ কয়েকবার দেশের বাইরে সেটেল হবার সুযোগ থাকলেও যাইনি। কারণ আমার দেশে থাকতেই বেশী ভালো লাগে কিউট যতসব সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে। একদিন ফুড়ুৎ করে মরে যাবো – মনে রাখার মতো কিছু একটা তো করা দরকার।

জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেছিলাম চাকরী করবো না, চাকরী সৃষ্টি করবো। জীবনে সফলতা মানে শুধু বাড়ি, গাড়ী ও টাকা নয়, সফলতা মানে সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সম্পদ আর একজন ভালোমানুষ। আজ আমি ১৪০ টি পরিবারের হাসি মুখ প্রতিদিন দেখতে পাই – এটাই আমার কাছে সফলতা।

আমার উদ্যোগ গুলোর সর্বশেষ সংযোজন আলাদীন ডট কম। প্রযুক্তির মাধমে একটু অন্যরকম সেবা দেয়ার প্রত্যয়। আমার কাছে এখন নতুন কিছু করা মানে নিজের সাথে আরও কিছু মানুষকে স্বপ্ন দেখানো। নিজে স্বপ্ন দেখি ও তরুণদের স্বপ্ন দেখাই – এটা আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা যা আমি কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়া করি এবং অনেক সময় দিই। গত ২ বছরে প্রায় ২৫ জন তরুণের মাঝে এই স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পেরেছি – এটাই বিশাল প্রাপ্তি। তারা এখন অন্যকে চাকরী দিচ্ছে। আর নিউজ প্রেজেন্টেশন ও বিজনেস প্রোগ্রাম উপস্থাপনা,  ওটাতো শখ করে করা। এই বছর প্রোজেক্ট “নিজের বলার মত একটা গল্প” – নামে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা থেকে ১৬৪ জন তরুণ ও তরুণীকে নিয়ে ৩ মাস ব্যাপী উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ গ্রহন করেছি।  এই ৯০ দিনের এই কোর্সে প্রতিদিন একটু একটু করে বিনা মূল্যে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিজনেস আপনার মুলধন আপনার, আমরা আপনাকে স্বপ্ন দেখাব ও কৌশল শিখিয়ে দিব।

এসএসসি পাশ করেই চামেলি আমার জীবনে চলে আসে, আমাদের বিবাহ হয়। তারপর তার এইসএসসি, গ্রাজুয়েশান, মাস্টার্স, ফ্যাশান ডিজাইনিং, আবার এমবিএ করে আমার পাশে পাশে থেকেই। এখন সে একটা অফিসের সিইও আর এটিএন বাংলা টিভি নিউজ প্রেজেন্টার। আমার বউ – চামেলি আমার জীবনে না এলে এবং ওর সহযোগিতা না পেলে আমার জীবনে কিছুই হতো না।

সিঙ্গার বাংলাদেশে যোগ দেয়ার ৬ মাসের মাথায় ও অপটিম্যাক্সের শুরুর দিকের মারাত্মক ক্রাইসিসের সময় আমার প্রাণ প্রিয় বাবা মারা গেলেন । আমার চারিদিকে যেন শুধু অন্ধকার । তারপর থেকে আমার মা আমার কাছে । এই ২জন মানুষের দোয়া আমার জীবনের সব সফলতার চাবিকাঠি ।

জীবনের প্রায় সকল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণী পেলেও ক্যারিয়ার, পরিবার, আত্মীয় পরিজন ও বন্ধু বান্ধব ও নিজের কাছে প্রথম শ্রেণীতে থাকাটা কখনো হাত ছাড়া করিনি।

সর্বোপরি সফলতা মানে খুশি থাকা – এটাই আমার জীবনের বলার মতো ছোট্ট গল্প।

সবার জীবনে বলার মতো একটা গল্প থাকা দরকার।

 

ইয়ুথ ভিলেজ/ বিশেষ প্রতিবেদক