কিশোরগঞ্জের যত ঐতিহাসিক স্থান

বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর বাড়ি, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ, পাগলা মসজিদ, বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম মসনদে ঈশা খাঁর বাসস্থান জঙ্গল বাড়ি দুর্গ, পরিখা মসজিদ, এগারসিন্দুর গ্রাম ইত্যাদি অনেকগুলো ঐতিহাসিক স্থানের কারণে কিশোরগঞ্জ জেলা বিখ্যাত। পূর্ব থেকে কিশোরগঞ্জ জেলা অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ। কিশোরগঞ্জ জেলা পর্যটন জেলা হিসেবেও খ্যাত। এখানে বেবুদ রাজার দীঘি, ভেলুয়া সুন্দরীর দীঘি, শাহ মাহমুদের মসজিদ, মাজার, সাদী মসজিদ ইত্যাদি রয়েছে। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওড় বর্ষায় পানিতে ভরে যায়। থৈ থৈ পানিতে উপচে পড়া ঢেউয়ের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় জমায় দেশ বিদেশের হাজারো পর্যটক। এছাড়া কিশোরগঞ্জের পাবলিক লাইব্রেরী, সেকান্দার নগর সাহেব বাড়ি, কিশোরগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টার, গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি, তাড়াইলের জাওয়ার সাহেব বাড়ি, শাহ সেকান্দার মাজার, দেওয়ান বাড়ি, দিল্লীর আখড়া ইত্যাদি পর্যটকদের নয়ন জুড়ায়। আসুন জেনে নিই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক কয়েকটি স্থান সম্পর্কে।

জঙ্গলবাড়ি দূর্গ

জঙ্গলবাড়ি দূর্গটি ঈশা খাঁর বাসভবন হিসেবে খ্যাত। ধারণা করা হয়, এগারোসিন্দু যুদ্ধে ঈশা খাঁ মানসিংহের কাছে পরাজিত হওয়ার পর লক্ষণ সিং হাজরার কাছ থেকে এই বাড়িটি কিনে নেন। এই দুর্গটি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে অবস্থিত। দুর্গের অভ্যন্তরে ঈশা খাঁর অনেকগুলো স্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। দুর্গের বাইরে অনেক ভগ্নাংশ, ইটের টুকরা, মাটির তৈরির পাত্রের অনেক নিদর্শন বলে দেয় সম্ভবত এটি প্রাক মুসলিম আমলের দুর্গ। ধারণা করা হয়, তৎকালীন সময়ে এই দূর্গটি বেশ সমৃদ্ধ ছিল। উক্ত অঞ্চলটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। নরসুন্দা নদীর তীরের এই দুর্গটি ছিল ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। দূর্গটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় এটি ছিল বৃত্তাকার আকৃতির। দুর্গটির দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরে পরিখা খনন করা আছে। জঙ্গল বাড়ি দূর্গটি একসময় স্মৃতি ঘেরা থাকলেও আজ হারাতে বসেছে সব। স্থানীয় প্রশাসন স্মৃতিস্বরূপ দরবার হলকে ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে স্থাপন করেছেন। এছাড়াও ঈশা খাঁর কয়েকটি ফটোগ্রাফ, বংশ তালিকা রয়েছে। এই কয়েকটি স্মৃতি ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছুই নেই যা থেকে পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ কালের আবহে ঐতিহাসিক স্থানে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছে। কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় এই বিখ্যাত ঈদগাহ মাঠটি অবস্থিত। নরসুন্দা নদীর তীরে প্রায় সাত একর জমি নিয়ে এই ঈদগাহ মাঠটির অবস্থান। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ মাঠ হলো শোলাকিয়া মাঠ। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে এক সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। আরেক মতে ৫০টি কাতারে ১ লাখ ৫০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায় দেখা যায় পাশের খোলা জায়গা, রাস্তা এমনকি বাড়ির উঠানেও ঈদের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। প্রতিনিয়ত মুসল্লিদের সংখ্যা বাড়ছে।

ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ

কিশোরগঞ্জের হারুয়া নামক স্থানে অবস্থিত পাগলা মসজিদ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত এই পাগলা মসজিদটি আড়াইশো বছরের পুরনো। মসজিদটি তিনতলা বিশিষ্ট হলেও অনেক দূর থেকে এই মসজিদের পাঁচ তলা বিশিষ্ট সুউচ্চ মিনারটি দেখা যায়। পাগলা মসজিদের অভ্যন্তরীণ কারুকাজ সুন্দর ও গোছালো। জনশ্রুতি আছে, এই পাগলা মসজিদটি এক পাগলের মৃত্যুর পর নির্মানণকরা হয়েছে। নরসুন্দা নদীর মধ্য থেকে মাদুরের উপর চেপে এক পাগলবেশী আধ্যাত্মিক পুরুষ বর্তমানে যেখানে পাগলা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে এসে থিতু হন। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর এখানে পাগলা মসজিদ নির্মাণ করেন স্থানীয়রা। শুধু মুসলিমদের কাছে নয়, অন্যান্য ধর্মালম্বী মানুষদের কাছেও এই মসজিদটি পবিত্র স্থান। যেকোনো ধর্মের যে কেউ এখানে এসে কোনো নিয়ত করলে, দান খয়রাত করলে তা পূর্ণ হয়। পূর্বে মসজিদটি ১০ শতাংশ জায়গা নিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে মসজিদের অবস্থান ৩ একর ৮৮ শতাংশ জায়গা জুড়ে।

কুতুব শাহ মসজিদ

বাংলাদেশের একটি প্রাচীন মসজিদ হল কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে অবস্থিত কুতুব শাহ মসজিদ। এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে খ্যাত। কথিত আছে সুলতানী আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। এই মসজিদের কোনো শিলালিপি নেই যার মাধ্যমে সঠিক তারিখ, সাল জানা যাবে। তাই সুলতানী আমলের মসজিদ হিসেবেই পরিচিত। কুতুব শাহ মসজিদের পাশে রয়েছে কুতুব শাহ নামের একজন ব্যক্তির কবর। তার নামানুসারে এই মসজিদটির নামকরন করা হয়েছে। ১৯০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই মসজিদটিকে সংরক্ষিত হিসেবে নথিভুক্ত করে। সাধারণত এই ধরনের মসজিদ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট হয়, তবে কুতুব শাহ মসজিদ পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদের স্থাপত্য, নির্মান শৈলী সুন্দর ও পরিপাটি। মসজিদের স্থাপনায় রয়েছে ঐতিহাসিক ছোঁয়া।

ঐতিহাসিক এগারসিন্দুর গ্রাম

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় অবস্থিত এগারসিন্দুর গ্রাম ইতিহাসের উজ্জ্বল নিদর্শন। প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর অসাধারণ নিদর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্যে ভরপুর এগারসিন্দুর গ্রাম। এগারসিন্দুর গ্রামে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আছে অনেক স্থাপত্য ও সমাধি। এখানে রয়েছে এগারসিন্দুর দূর্গ, শাহ মাহমুদ মসজিদ, সাদী মসজিদ, বেবুদ রাজার দীঘি। প্রতিটি স্থাপনা কালের স্বাক্ষর, ইতিহাস বহন করে। এগারসিন্দুর দুর্গ প্রাচীন ইতিহাস বহন করলেও বর্তমানে এর অস্তিত্ব নেই। সেখানে শুধু একটি কবর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেউ কেউ বলেন রাজা আজহাবা নির্মান করেছিলেন এই দুর্গ। আবার কেউ কেউ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে বাংলার বারো ভূঁইয়া খ্যাত ঈশা খাঁ কোচ হাজং রাজাদের পরাজিত করে এই দূর্গ দখল করেন। পরবর্তীতে এটি ঈশা খাঁ দূর্গ নামে পরিচিত ছিল।

গবেষকদের মতে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে শাহ মাহমুদ মসজিদ এবং ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে সাদী মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

কিশোরগঞ্জে যেভাবে যাবেন

গুলিস্তান থেকে প্রতি ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের বাস ছাড়ে। এছাড়া মহাখালী থেকে কিশোরগঞ্জ ট্রাভেলস, ডিজিটাল অনন্যা, এগারসিন্দুর, হাওড় বিলাস ছাড়ে। সকাল ৭.৩০ মিনিটে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসে করে মাত্র ৩ ঘণ্টায় পৌছানো যায় কিশোরগঞ্জে। সেখানে গিয়ে রিকশা, সিএনজি কিংবা বাসে করে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারবেন।

ইয়ুথ ভিলেজ/নাজনীন আক্তার