কালো রাতের স্মৃতিচারণ

১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৬। গ্রামের নাম মাধবপুর। গ্রামের একমাত্র নামকরা স্কুল মাধবপুর জেনারেল হাই স্কুল। স্কুল মাঠের চতুর্দিকে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা করছে ছেলে-মেয়েরা। আজ বিজয় দিবস উপলক্ষে ছোটখাটো একটা মেলার মত আয়োজন করা হয়েছে স্কুল মাঠে। কিছুক্ষণ বাদেই শুরু হবে গ্রামের সব থেকে জমজমাট অনুষ্ঠানটি। প্রতি বছরই বিজয় দিবস উপলক্ষে এই মাঠে স্কুল কর্তৃপক্ষের আয়োজনে স্কুলের শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর অংশগ্রহনে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সাথে বিজয়মেলাও অনুষ্ঠিত হয়। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয় নি।

“ওয়ান, টু, থ্রী, হেলো………..মাইক টেস্টিং…………হেলো”। হঠাৎ মাইকে আওয়াজ শোনা গেল। মাঠে উপস্থিত সবাই একটু নড়ে চড়ে বসলো। মাইকে আওয়াজ শোনা গেছে, মানে অনুষ্ঠান শুরু হতে আর বেশিক্ষণ বাকি নেই। এই সময়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক শিক্ষকের কন্ঠ শোনা গেল, “সবাই শৃঙ্খলা বজায় রেখে নির্দিষ্ট স্থানে বসে পড়ুন”। ইতোমধ্যে প্রধান শিক্ষকও চলে এসেছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন। এই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি দেশের জন্য। কিন্তু তিনি ছাড়া স্কুলের আর কেউ ই কথাটা জানে না। প্রতি বছরের মত এবারও তিনিই আজকের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী দের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা অনুষ্ঠান কে আরো আকর্ষনীয় করে তোলে। গান, আবৃত্তি, খন্ড নাটক ইত্যাদি পরিবেশনা গুলো আগত দর্শনার্থীদের অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত আটকে রাখে।

স্কুল মাঠ খুব দ্রুতই কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঠে তিল ধারণের ঠাই পর্যন্ত নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাতীয় সংঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। প্রধান শিক্ষক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন। উদ্বোধন শেষে তিনি তার বক্তৃতায় উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আজ আমি আপনাদের এমন একটি গল্প শোনাব যা একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া নির্মম সত্য ঘটনা”। এ কথা বলেই তিনি তার গল্প বলা শুরু করলেন।

“বেশ দীর্ঘ সময়ের একটা পুরনো ঘটনা। রাজু নামের এক ছেলে ছিল। রাজুর বয়স পনের। ক্লাস এইটের ছাত্র। সময়টা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের ঠিক আগে আগে। ওরা তিন ভাই-বোন। রাজু, ওর বোন মিতা আর ওদের ছোট ভাই তপু। মিতা পড়ে ক্লাস ফোরে আর তপু তখন কেবল হামাগুড়ি দিচ্ছে। তপুর জন্মের পর পরই ওদের মা মারা যায়। ওদের পিতা ইস্কান্দার হোসেন একটা হাইস্কুলের হেডমাস্টার। মা মরা সন্তানদের নিজ বুকে আগলে রেখে মায়ের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। তাদের নিয়ে বেশ ভালই দিন কাটাচ্ছিলেন ইস্কান্দার।

সেদিন ছিল ২৫শে মার্চ, ১৯৭১। সমস্ত পৃথিবী তখন ঘুমন্ত। হঠাত ইস্কান্দার শুনতে পেলেন বাইরে গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। রেডিওতে শুনেছিলেন করা যেন তাদের দেশটাকে দখল করতে চায়। তিনি বাহিরে শিশু ও মহিলাদের আর্তনাদ ও চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন গ্রামে হানাদার বাহিনী আক্রমন করেছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ করে কারা যেনো তার ঘরের সদর দরজা ভেঙ্গে ফেল্ল। ভেতরে তিন অস্ত্রধারী আর্মি প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকেই তারা ইস্কান্দার কে জোর করে তাদের সাথে নিয়ে যাচ্ছিল। চিৎকার-চেচামেচি তে রাজু আর মিতার ঘুম ভেঙ্গে গেল। রাজু তৎক্ষনাত কিছু বুঝতে না পারলেও ওর বাবা কে যে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে পারল। সে লোক গুলো কে বাধা দিতে চাইল। তাদের একজন পিছনে ফিরে রাইফেলের বাট দিয়ে রাজুর পিঠ এ সজোরে আঘাত করলো। হঠাৎ করে মিতা খাটের নিচ থেকে লোহার রড টা বের করে এক জনের মাথায় বাড়ি মারলো। লোকটা কিছুটা আহত হলো বটে। কিন্তু তার সঙ্গীদের একজন তার দিকে রাইফেল তাক করে ট্রিগার চেপে দিল”।

এই টুকু বলে আমজাদ খানিকটা থামলেন। তার গলাটা যেন ধরে এল। চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা অশ্রুও ঝরছিল। তিনি আবার বলা শুরু করলেন।

“চোখের সামনে নিজের মেয়ের নৃসংশ হত্যা সহ্য করতে পারলেন না ইস্কান্দার। মিলিটারীদের থেকে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে মেয়ের কাছে ছুটে গেলেন তিনি। পিশাচগুলো তাকেও ছাড়েনি। রাজুর চোখের সামনে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করলো। রক্তাক্ত হয়ে গেল রাজুদের ঘর। হতভম্ব হয়ে গেল রাজু। চোখের সামনে বাবা ও বোনের মৃত্যুর নির্মম দৃশ্য দেখে সে কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল এখানে ওরা নিরাপদ না। যে কোনো সময়ে সেও ওদের শিকার হতে পারে। তাই সে খুব দ্রুত তপু কে নিয়ে বাবা ও বোনের নিথর দেহ ওভাবেই রেখে ঘর থেকে অন্ধকার রাতেই বেরিয়ে পড়ল। রাতের আধারে সে দেখতে পেল তার মতই আরো অনেকে পালিয়ে যাচ্ছে। সে দেখল নদীর ধারে দুটি নৌকা। সবাই সেখানেই উঠছিল এক এক করে। সেও তপুকে নিয়ে একটা নৌকোতে উঠতে গেলে বাধা পেল। সে শুনতে পেল কেউ তাকেই উদ্দেশ্য করে বলছে নৌকা এমনিতেই অতিরিক্ত ভার হয়ে গিয়েছে। আর একজন ও উঠলে নৌকা ডুবে যেতে পারে। সে খুব অনুনয়-বিনয় করল যেনো শুধু মাত্র তাকে আর তার ভাইকে তারা নেয়। কিন্তু তাকে নিরাশ হতে হল। কেউই এই অসহায় বাচ্চা দুটোকে করুনা করল না। সে তখন দৌড়ে দ্বিতীয় নৌকার দিকে ছুটল। কিন্তু ইতমধ্যে সেটি ছেড়ে দিয়েছে। সে পুনরায় প্রথম নৌকায় ফিরতে ফিরতেই দেখল প্রথম নৌকাও চলা শুরু করেছে। সে তখন চিৎকার করে তাদের ডাকতে থাকল আর অনুরোধ করতে থাকল যেন তার ছোট ভাইটিকে অন্তত তারা নেয়। তপুকে দেখে মালিকের দয়া হলো। সে রাজুকে বল্লো যে ২ জন উঠলে নৌকা ডুবে যাবার সম্ভাবনা বেশি। তিনি শুধু তপুকে নিতে পারবেন। রাজু তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে তপুকে তার হাতে তুলে দিল। তপুকে নিয়ে তিনি রাজু কে কথা দিলেন তাকে নিজ সন্তানের মত লালন-পালন করবেন। আর যদি কখনো রাজুর সাথে তার দেখা হয় তাহলে তপুকে তার কাছে ফিরিয়ে দিবেন। নৌকা ছেড়ে দিল। দুর থেকে আরো দুরে চলে যাচ্ছে নৌকা। রাজু দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছে নৌকার চলে যাওয়া, চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত সে সেদিকে তাকিয়েই থাকলো”।

আবার থামলেন আমজাদ হোসেন। জোরে শ্বাস নিলেন। এতক্ষণ কেউ লক্ষ্য করে নি যে আমজাদের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছিল। তিনি আবার বলা শুরু করলেন, “সেদিনের পর সেই রাজু তপুকে অনেক খুঁজেছিল। ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি কোনো জায়গাই বাদ রাখে নি। কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পায় নি। আজও তার দু’চোখ তপুকে খুঁজে ফিরে হাজার মানুষের ভিড়ে”।

এ কথা বলার পর আমজাদ হোসেন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলেন না। মাঠভর্তি মানুষের সামনেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। কারোরই আর বুঝতে বাকি রইলো না যে সেই রাজুই হলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন। স্কুল মাঠে আবেগঘনো এক পরিবেশ তৈরী হলো। সবার চোখেই পানি। তার চোখের পানি যেন সবার চোখ থেকেই অশ্রু ঝরায়। প্রধান শিক্ষক নিজ কে সামলালেন। তিনি তার বক্তৃতা শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। পরিবেশটা আবার আগের মত উৎসবমুখর হয়ে উঠলো। স্কুল মাঠটা হাসি-আনন্দে ভরে উঠল পুনরায়।

 

-আব্দুল্লাহ ফুয়াদ